জানুয়ারিতে ঊর্ধ্বমুখী ছিল অধিকাংশ পণ্যের বাজারদর

২০২৬ সালের শুরুতেই বৈশ্বিক পণ্যবাজারে অস্থিরতা ও রেকর্ড মূল্যের এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুতেই বৈশ্বিক পণ্যবাজারে অস্থিরতা ও রেকর্ড মূল্যের এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের প্রথম মাসেও অধিকাংশ পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানোর পূর্বাভাস এবং তীব্র শীতের কারণে জ্বালানি ও ধাতব বাজারে এ রেকর্ড উত্থান দেখা দিয়েছে। খবর আনাদোলু।

জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মূল্যবান ধাতুর দাম। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দাম গত মাসে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০০৯ সালের পর এক মাসে সর্বোচ্চ। এতে জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতি এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতার কারণেই বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছেন।

একই সময় রুপার দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। সৌর প্যানেল ও উন্নত প্রযুক্তিতে রুপার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ধাতুটির দাম আউন্সপ্রতি ১২১ ডলার ৭০ সেন্টে পৌঁছেছে। এছাড়া শিল্পে ব্যবহৃত তামার দাম ৫ শতাংশ বেড়ে পাউন্ডপ্রতি ৬ ডলার ৬০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। চিলির খনিতে ধর্মঘট ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) ক্রমবর্ধমান চাহিদা তামার বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত প্যালাডিয়াম ও প্লাটিনামের দামও গত মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

জানুয়ারিতে জ্বালানি পণ্যের বাজার ছিল বেশ উত্তপ্ত। উত্তর গোলার্ধে স্বাভাবিকের চেয়েও তীব্র শীত ও তুষারপাতের কারণে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এতে নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক মাসে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭ ডলার ৮২ সেন্টে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের প্রভাবে জানুয়ারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনা এবং রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কায় জ্বালানি তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গত মাসে বিশ্বজুড়ে কৃষিপণ্যের বাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। উত্তর আমেরিকায় প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতের কারণে গমের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে এক মাসেই গমের দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

চালের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে; রফতানি বৃদ্ধি ও চাহিদার চাপে চালের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ, যা আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর দিয়েছে ভুট্টা। বিশ্বব্যাপী ভুট্টার উৎপাদন বাড়ার পূর্বাভাস থাকায় গত মাসে এর দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। মূলত উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই কৃষিপণ্যের দামে এ ভিন্নতা দেখা গেছে।

গত মাসে পণ্যবাজারে সবচেয়ে অবাক করার মতো ঘটনা ছিল কোকোর অস্বাভাবিক দরপতন। যেখানে বেশির ভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে, সেখানে কোকোর বাজার ছিল পুরোপুরি নিম্নমুখী। পশ্চিম আফ্রিকার প্রধান দুই উৎপাদনকারী দেশ আইভরি কোস্ট ও ঘানায় আবহাওয়া খুব ভালো থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। এ অতিরিক্ত সরবরাহের খবরে মাত্র এক মাসেই কোকোর দাম ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া কফি ও চিনির বাজারও গত মাসে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে ছিল। বিশ্ববাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় এ দুই পণ্যের দামও কিছুটা কমেছে।

বিশ্বব্যাংক আগে পূর্বাভাস দিয়েছিল যে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের গড় দাম গত ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে আসবে। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম মাসের চিত্র বলছে ঠিক উল্টো কথা। পূর্বাভাস ছাপিয়ে বেশির ভাগ পণ্যের দাম এখন বেশ চড়া।

পণ্যবাজার বিশেষজ্ঞ জাফর এরগেজেন আনাদোলু এজেন্সিকে বলেন, ‘সামনের দিনগুলোয় বাজার কেমন যাবে, তা মূলত নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কতটা কমাবে তার ওপর। যদি বড় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ আরো জোরালো হয়, তবে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের অর্থ নিরাপদ রাখতে আরো বেশি স্বর্ণ ও রুপা কিনতে শুরু করবেন। এতে মূল্যবান ধাতুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও